ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১০-২০১৮ ইং ০১:১৪:১৯ | সংবাদটি ২৯৫ বার পঠিত

সামনে অগাধ জলরাশি। পেছনে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী। ইতোপূর্বেই দুনিয়ার জঘন্যতম গণহত্যা এবং নারী নির্যাতনের নায়ক হিসেবে বর্বরতম সেনাবাহিনীর তকমা অর্জন করেছে ওরা। ধেয়ে আসছে পাকিস্তানি সৈন্য। ধরা পড়লে একই সঙ্গে যাবে সম্ভ্রম এবং প্রাণ। হাতের কাছে না পেলেও আগ্নেয়াস্ত্রের রেঞ্জের মধ্যে আসা মাত্রই প্রাণ সংহার করবে। তাই করছে ওরা। হয়তো আধা ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যেই শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে গুলিতে গুলিতে। আর বুলেট বিদ্ধ হয়ে যমদূতের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছেন ততোধিক। ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে সমানে ছুটতে ছুটতেই পেছনের শব্দ শুনছেন। নানা রকম আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন। দ্রাম-দ্রাম করে আওয়াজ কোনটির। কোনো কোনোটির শব্দ বেরুচ্ছে টেরেং টেরেং করে। গুড়–ম গুড়–ম, পটাশ-পটাশ, সাঁ, সাঁ আরো কত রকম আওয়াজ। শব্দ সৃষ্টি করছে আগ্নেয়াস্ত্র। শব্দ হচ্ছে পুড়ে যাওয়া বাড়ি ঘর থেকে। কাঁচা বাড়ি ঘরের বাঁশ ফুটছে প্রচন্ড শব্দ করে। আগুনের কুন্ডলি উঠছে উর্দ্ধ আকাশে। ধোঁয়ায় অন্ধকার চারপাশ।
বাড়ি থেকে যারা বের হতে সক্ষম হয়েছেন তারাই ছুটে চলেছেন দক্ষিণে, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। সে দিকে তো বিশাল হাওর। জল আর কেবলই জল। জলে ঝাঁপ দিচ্ছেন লোক শতে শতে, হাজারে হাজারে। সাঁতার কেঁটে কেঁটে চলে যাবার চেষ্টা করছেন দূরে বহু দূরে। এর আগেই রয়েছে একটি নদী অনেকেই আটকা পড়েছেন নদীর পাড়ে। সাঁতার দিতে জানেন না তারা। তার পরও ঝাঁপ দিয়েছেন জলে। গলা অবধি জলে ঢুকিয়ে পড়ে আছেন নিরব নিথর হয়ে। মায়া রাণী রায়ও জলে। সাথে ছেলেমেয়ে এবং অন্যান্য সদস্যরা। মাস দেড়েক হলো আশ্রয় নিয়েছেন বাড়িয়া গ্রামে। গাজীপুর সদর উপজেলার এই গ্রামটি বাড়িয়া ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। জয়দেবপুর থেকে কিলোমিটার দশেক দূরত্বে এর অবস্থান। প্রাণের ভয়ে শহর ছেড়ে সে গ্রামেই আশ্রয় গ্রহণ করেন মারা রাণীরা। আশ্রয় নিয়েছেন শহরের আরো অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ ও তাদের পরিবার। বাড়িয়ার ভোলা কর্মকারের বাড়িতে ওঠেছেন মায়া রাণীরা। সাদরে গ্রহণ করেছেন ভোলা কর্মকার। নিজের ছোট বাড়িটিতে থাকার জায়গা দিয়েছেন শহুরে অতিথিদের। শেয়ার করেছেন বিছানা ও খাবার। সাধ্য অনুযায়ী আপ্যায়ন করছেন তাদেরকে। তারপর থেকে সুখে দুঃখে কাটছে সময়। দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। চলে গেছে প্রায় দেড় মাস। তারপর ঘটে মহা প্রলয়। যা কল্পনাও করতে পারেনি বাড়িয়াবাসি এবং শহর থেকে পালিয়ে আসা লোকগুলোও।
ভয়াবহ সেই একাত্তরের ১৪ মে। জাতিদ্রোহী কুলাঙ্গাররা পথ প্রদর্শন করে করে পাকিস্তানি মিলিটারিদের নিয়ে যায় সেই গ্রামে। শহর থেকে এতো দূরের গ্রাম। রাস্তাঘাটও নেই তেমন একটা। ভাঙ্গাচোরা কাঁচা সড়ক। যে সড়ক পথে যন্ত্রচালিত যানে চড়ে মিলিটারি যেতে পারে কল্পনায়ও আসেনি কারো। কিন্তু সব অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিল হানাদার পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী। এ কাজে সহায়তা দিয়েছে বাংলা মায়ের কিছু কু-পুত্র। ওরা রাজাকার, আল বদর, আল শামস। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র হয়েছে রাজাকার আল বদররা। জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে পাকি মিলিটারিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। বাড়িয়া গ্রামে মিলিটারিদের নিয়ে যাওয়ার পেছনেও রয়েছে তাদেরই মূখ্য ভূমিকা। গ্রামে পৌঁছেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করছে মিলিটারি এবং রাজাকাররা। মানুষ পালাবার চেষ্টা করছে। আর, পেছন থেকে পাখির মতো গুলি করে মারছে তাদেরকে। গুলি করে করে মারছে শিশু নারী বৃদ্ধ সহ মানুষ। আটকে দিচ্ছে যুবতী সুন্দরীদের। প্রকাশ্যে বলৎকার করছে নারীর ওপর। এর মধ্যেও বহুলোক পালিয়েছেন উল্টোদিকে বেলাই বিল মুখি। মায়া রাণী রায়ও গ্রাম থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এক হাত দিয়ে ধরেছেন ৫ বছর বয়সী কন্যা দিপ্তী রাণী রায়কে। অন্য হাতে ৩ বছর বয়স্ক ছেলে অনীল চন্দ্র রায়। কখন ছেলে আর মেয়ের হাত ধরে দৌড়াচ্ছেন, কখনো ছেলেটাকে কোলে নিচ্ছেন। এ ভাবে পড়ি মরি করে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে।
মায়া রাণী রায়ের বয়স তখন ৩৫ বছর। স্বামীর নাম শচীন্দ্র মোহন রায়। জয়দেবপুরের উত্তর বিলাসপুরে বাস করতেন তারা। এখনো তাই করছেন। সেখান থেকেই প্রাণ রক্ষার তরে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাড়িয়া গ্রামে। বাঙালি জাতির মহা দুর্যোগের সময় নিজেদের পৈত্রিক নিবাস অভিমুখি হননি মায়া রাণী। একই জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বাইমান তালাবর গ্রামের চেয়ে নিরাপদ ভেবেছিলেন ভাওয়াল বাড়িয়াকে। তাইতো উল্টোরথে চলা। বাড়িয়া গ্রাম ছেড়ে ভোলাই বিলের দিকে ছুটছেন শত শত লোকের মতো করে। লোকজন ঝাঁপ দিয়েছে জলে কেউ সাঁতরে সাঁতরে চলে গেছেন পাকি মিলিটারির নাগালের বাইরে। কেউ আছেন কোমর পানি বুক পানিতে। জল ঠেলে ঠেলে অগ্রসর হচ্ছেন সামনে। ভোলাই বিলের ভেতর দিয়েই একটি খাল বা নদী। বর্ষায় এর কোনো চিহ্ন না থাকলেও গ্রীষ্মকালে জলযান চলে এই খাল দিয়ে। বিল আর গ্রামের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারি খাল। সেই অবধি যাবার পর অনেকেরই যাত্রা স্তিমিত হয়ে পড়ে। যেটুকু পথ পেরিয়ে এসে আটকা পড়েছেন তারা। সেই খালের পাড়েইতো ধর্ষিতা হয়েছেন অসংখ্য নারী। বাবা মা সহ পরিবারের ৫ সদস্যকে হত্যা করে সেখান থেকেই তুলে নিয়েছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা শৈল বালা দাসকে। এ সবের অনেকটা দেখতে পাচ্ছেন মায়া রাণী। ভয়ে কাঁপছে অন্তরাত্মা। ঠক ঠক করছে পা জোড়া। তারপরও দাঁড়াবার উপায় নেই। পালাতে হবে তাকে ৫ সন্তান নিয়ে। কিন্তু খাল পেরুবেন কেমন করে? ২০১৬ সালে ২১ জানুয়ারি উত্তর বিলাসপুরের বাসার দাওয়ায় বসে সাক্ষাৎকার দেবার কালে বলেন, ভালো করে সাঁতার কাঁটতে পারতেন না তিনি। তারপরও ঝাঁপ দিতে হলো জলে। ঝাঁপিয়ে পড়লেন খালের জলে। দুই কোলে দুই সন্তান দিপ্তি রাণী রায় ও অনীল চন্দ্র রায়। আতঙ্কে চিৎকার করছে সন্তানরা। জলে নামেনি ওরা এর আগে কখনো। এমন জলাশয় দেখারও সুযোগ হয়নি তাদের। তারপরও নামতে হয়েছে। জোর করে নামিয়ে দিয়েছেন মা। জীবন রক্ষা করতে হলে এর বিকল্প আর খোঁজে পাননি মায়া রাণী।
পাকিস্তানি সৈন্যরা চলে আসছে আরো সামনে। সাথে রয়েছে বাঙালি রাজাকাররা। ভয়ে আতঙ্কে আড়ষ্ট মায়া রাণী। নিজের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে ভীতিজনিত কারণে। আর, বাচ্চাদের বুক ফেঁটে কান্না বেরুচ্ছে একই কারণে। কাঁদছে তারা ভয়ে। কিন্তু কান্নার শব্দ যে কতোটুকু বিপজ্জনক হতে পারে তা কেমন করে বুঝাবেন অবুঝ শিশুদের। বুঝাতে পারেন নি মা। কত রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন আবার ব্যর্থ হয়েছেন। শেষ বারের চেষ্টায় সফল হয়েছিলেন তিনি। কান্না বন্ধ হয়েছিল সন্তানদের। জীবনে আর কখনো কাঁদেনি ওরা। কাঁদবেও না কোনো দিন। ডর ভয় কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি তাদের। কোলে উঠেনি বা উঠবে না অনীল চন্দ্র রায়। মায়ের হাত ধরে ধরে দৌঁড়াবে না কোনো দুর্দিন দুর্বিপাকে দিপ্তী রানী রায়। পিছু পিছু ছুটবে না শেফালি রাণী রায়। কিন্তু কেন? মায়ের অসর্তকতা কিংবা অতিরিক্ত সতর্কতার কারণেই সেখানে প্রাণ ত্যাগ করেন ৩ ভাই-বোন। তারা সবাই হয়ে গেলো স্বাধীনতার বলি। মহান শহীদ।
মা নেমেছেন জলে। সন্তানরা কাঁদছে ভয়ে। ধেয়ে আসছে পাকিস্তানি মিলিটারি। অল্প সময়ের মধ্যেই ধরা পড়ে যাবেন তারা। এর আগেই জলে ডুব দিতে হবে। তা হলে দেখবে না মিলিটারিরা। দেখবে না রাজাকাররা। সন্তানরা নামছে না জলে। মিলিটারি নয় এর চেয়েও অধিক ভয় করছিলো তারা এখন হাওর আর খালের বিপুল জলরাশিকে। কিন্তু কথায় আছে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। মায়া রাণীরও তাই হলো। মিলিটারি তো বেশি দূরে নয় আর। তাড়াতাড়ি করতে হবে যা করার। ৩ সন্তানকে একত্রে বগল দাবা করে ডুব দিলেন জলে। দীর্ঘ ডুব। ভেসে ওঠার নাম নেই আর। সময় যাচ্ছে-যাচ্ছে। সময় যাচ্ছে। এক সময় জলের ভেতর থেকে মাথা তুলে ধরলেন। দৃষ্টিতে বন্দি হলেন অন্যদের। ভুলে গেছেন এখন সন্তানদের কথা। তারা কান্না করছে না। চিৎকার দিয়ে মিলিটারির দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না আর। তা হলে মায়া রাণী নিরাপদ হয়ে গেছেন। সন্তানরাও নিরাপদ। এখন আর ভয়ের কোনো কারণ নেই। মায়া রাণী খুশি। তার কোনো ভয় নেই আর। মিলিটারিরা দেখবে না তাকে। কিন্তু কারা আসছে। খাল থেকে টেনে টেনে ওঠায় তাকে। বেশ কিছু স্বর্ণ এবং অর্থও ছিলো সাথে। শরীরের সঙ্গেই বাঁধা সেগুলো। কিন্তু কারা যে খুলে খুলে নিয়ে গেলো বুঝতেই পারেন নি মায়া রাণী। তারপর তাকে নিয়ে যায় পলায়নপর লোকেরাই। নিয়ে গেছে নাগরীতে। নাগরী একটি খ্রিস্টান পাড়া। আশ্রয় পেলেন সেখানে। তারা দিলেন থাকার জায়গা, খাবার জন্য খাদ্য। পরে ভারতে যাবারও ব্যবস্থা হলো। গেলেন সে দেশে। বাকি সময়টুকু সেখানেই কাঁটে তার।
স্বাধীনতার পর ফিরলেন দেশে। জয়দেবপুরের উত্তর বিলাসপুর। সেইটির পরিচিত স্থান, সেই বাসা। সেখানেই প্রবেশ করলেন মায়া রানী রায় এবং পরিবারের অন্য ক’জন সদস্য। কিন্তু আসেনি শেফালি রাণী রায়, দিপ্তী রাণী রায় এবং অনীল চন্দ্র রায়। মায়া রাণী কোনো ভাবেই স্মরণ করতে পারেন নি কখন, কিভাবে, নিজের হাত থেকে ফসকে গেলো ৩ সন্তান। কখনই বা বন্ধ হয়েছিল তাদের কান্না। কেমন করে মারা গেলো তারা। কখন যে কোন দিক দিয়ে ভেসে গেলো তাদের মৃতদেহ কিছুই বুঝলেন না, কিছুই দেখলেন না। একবার স্মরণও করতে পারেন নি তাদের কথা।
তিন সন্তান হারালেন মায়া রাণী। চলে গেলো অর্থ-স্বর্ণও। বাড়ি ঘরেও কিছুই ছিলো না। সবই লুটপাট হয়ে গেল। এ সবের বিনিময়ে পেলেন একটি খাম। এসেছে বঙ্গভবন থেকে। সমবেদনা প্রকাশ করে চিঠি লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাথে তাঁরই স্বাক্ষর করা একটি চেক। দুই হাজার টাকার এই চেকও পাঠিয়েছেন বঙ্গবন্ধ্।ু তিন সন্তানের বিনিময়ে পেয়েছিলেন এই চেক খানা।
৮০ বছর বয়সী মায়া রাণী রায় জ্বলছেন সন্তান হারানোর জ্বালায়। ৪৫ বছর ধরে হাহাকার করছে তার অন্তর। আমৃত্যু জ্বলে পুড়ে ছারখার হবেন। এর মধ্যে শান্তনা শুধুই বঙ্গবন্ধুর চিঠি এবং ২ হাজার টাকার চেক। যার মূল্য ৩ সন্তানের জীবন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT